ছবি প্রবাসন নিউজ
বিগত সময়ে কায়েমী স্বার্থের কারণে জনশক্তি রফতানি খাতের সমস্যাগুলো সমাধান করা হয় নি। অন্তর্বর্তী সরকারকে এই সেক্টরের সংস্কারে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। সাপ্তাহিক প্রবাসন ও রাবিডের আয়োজনে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার আলোকে জনশক্তি রফতানি খাতের সংস্কার’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এই কথা বলেন।
৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় রাবিড কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অথিতি ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জন নেতা জোনায়েদ সাকি। জনশক্তি রফতানি খাতের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন রাবিডের সভাপতি আরিফুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো.ছিদ্দিকুর রহমান ভূঞা, কোষাধক্ষ্য সৈয়দা পারভীন আক্তার, মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ, আমির হোসেন ভূঞা টিপু, মো. শাহরিয়ার প্রমুখ। মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন সাপ্তাহিক প্রবাসনের সম্পাদক খোকন দাস।
সভায় জননেতা জোনায়েদ সাকি এই সেক্টরের কি কি সমস্যা, কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার দরকার সে বিষয়গুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সভার শুরুতে এই সেক্টরে সংস্কার কেন জরুরি এই বিষয় তুলে ধরতে গিয়ে রাবিড সভাপতি আরিফুর রহমান বলেন,‘আমাদের শ্রমবাজার মালয়েশিয়াকেন্দ্রীক, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রীক। এর বাইরেও একটা বিরাট মার্কেট রয়ে গেছে। সেই মার্কেটটা ধরার জন্য সরকারসহ এই সেক্টরের অংশীজনদের একটা সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
শ্রমিকরা বিদেশ যেতে এই দেশেই প্রতি পদে পদে হয়রানির শিকার হন, আবার বিদেশে গিয়েও নানা হয়রানির মধ্যে পড়েন। বায়রা, বিএমইটি সংশ্লিষ্ট সকলে এই বিষয়ে উদাসীন। উদাসীন হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এই কর্মীরা দরিদ্র, সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে এই কর্মীরা ভোটার নয়। আমরা বলেছি যে, এই কর্মীদের ভোটার করা হলে এই সেক্টরে একটা ম্যাজিক্যাল পরিবর্তন হবে। তখন বিএমইটি, বায়রা এমনকি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও কর্মীদের সেবা দেয়ার জন্য দৌঁড়াবে।’
তিনি বলেন,‘ইউরোপের বাজার এমন কি মধ্যপ্রাচ্যের বাজার চলে গেছে নেপাল, ভারত ও শ্রীলংকার মতো দেশগুলোর হাতে। কেননা ওই দেশগুলো দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারে। দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার জন্য আমরা রাবিডের পক্ষ থেকে উত্তরার দিয়া বাড়িতে একটা ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তুলেছি, একটা ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার গড়ে তুলেছি।’
তিনি বলেন, ‘এইসব সমস্যা সমাধানে অংশীজনদের নিয়ে যে একটা নীতিমালা তৈরি করা দরকার সেটা হচ্ছে না। তবে নতুন পরিস্থিতিতে এইসব বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলতে পারছি, আগে তো কথাই বলা যেত না। আমরা এই সেক্টরের কি ধরনের সংস্কার দরকার সেই প্রস্তাবনা প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কাছে তুলে ধরেছি, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জনাব তৌহিদ হোসেনের কাছে তুলে ধরেছি। বায়রাকে ছাড়াই আমরা সংস্কার প্রস্তাবনা তুলে ধরেছি। আগে বায়রাকে ছাড়া এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়াই যেত না। বায়রার অনেক নেতাও আমাদের এই প্রস্তাবনার সঙ্গে একমত হয়েছেন।’
আরিফুর রহমান বলেন,‘আমরা সংস্কার প্রস্তাবনায় বলেছি, সফটওয়্যারের মাধ্যমে এক টাকা খরচ ছাড়াই কর্মী পাঠানো সম্ভব। যারা কর্মী নেবে তারা অনলাইনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে চাহিদাগুলো জানাবে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সেই অনুযায়ী লোক পাঠাবে, এখানে এক টাকাও খরচ হবে না। উল্টো আমরা সার্ভিস চার্জ পাবো। প্রতিটা সেক্টরে অনলাইন হয়ে গেছে, এই সেক্টরে কেন হবে না? বর্তমান প্রযুক্তির যুগে তা সহজে করা সম্ভব। তা করা হলে বিরাট পরিবর্তন হয়ে যাবে এই সেক্টরে। আমরা যদি ইউরোপের বাজার ধরতে পারি বড় ধরনের পরিবর্তন হয়ে যাবে।’
জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির এই অগ্রগতির জন্য আমাদের প্রবাসীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। কিন্তু অভিবাসীরা নানা রকমের হয়রানি ও বাধার মুখোমুখি হন দেশের অভ্যন্তরে ও দেশের বাইরে। এমন কি কর্মস্থলে যদি মৃত্যুবরণ করেন তাদের লাশ আনার ক্ষেত্রে মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাদের এইসব করুণ কাহিনিগুলো যখন আমরা শুনি তখন প্রবাসীদের নিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো কথার ফুলঝুরি হিসেবে থেকে যায়। রাষ্ট্রের আইন-নীতিমালা, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে এই সেক্টরের জন্য অনুকূল নয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির কারণ - এই সত্যটাই সামনে চলে আসে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, সরকারের যে আইন ও নীতিমালা আছে সেগুলো প্রবাসীদের পক্ষে যেন কাজ করে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যাতে সাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে, সবাইকে যেন একটা জবাবদিহিতার মধ্যে আনা যায় এই জায়গাগুলোতে বড় ধরনের সংস্কার আনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সংস্কারের ক্ষেত্রে আমরা দুটো বিষয়ে গুরুত্ব দেবো, তার একটি হচ্ছে যারা বিভিন্ন দেশে শ্রমিক হিসেবে গেছেন তারা যদি দক্ষ হয়ে যেতেন তা হলে তারা যে রেমিট্যান্স পাঠান এর পরিমাণ দ্বিগুণ হতো। তারা এখন যে আয় করেন তার চাইতে দ্বিগুণ আয় করতে পারতেন। রাষ্ট্রের সামান্য মনোযোগ ও বিনিয়োগ যে বিরাট পরিবর্তন ঘটাতে পারে সমৃদ্ধিতে সে বিষয়ে মনোযোগের অভাব আছে।’
জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে আমাদের এম্বাসিগুলো আছে এবং দেশের অভ্যন্তরে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেখানে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে যাতে শ্রমিকরা কোন হয়রানির শিকার না হয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ হচ্ছে কর্মীরা যাতে হয়রানির মধ্যে না পড়ে তা নিশ্চিত করা। তারা যেন নিরাপদে বিদেশে যেতে পারেন, সেখানে কাজ করতে পারেন এবং নিরাপদে দেশে ফিরে আসতে পারেন এই জন্য নীতিমালায় বড় ধরনের সংস্কার দরকার। আর একটা জায়গায় সংস্কার করতে হবে অভিবাসন ব্যয় কমানোর জন্য। এখন আইন নীতিমালা এমনভাবে কাজ করছে যা পদে পদে ঘুষ দুর্নীতির সুযোগ করে দিচ্ছে, সংস্কারের মাধ্যমে এইগুলো দূর করতে হবে। আমলাতন্ত্র যেমন এখানে ভূমিকা রাখছে তেমনি দেশি বিদেশি বিভিন্ন পক্ষও এতে কাজ করছে। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র দেশের স্বার্থের পরিবর্তে অন্য দেশের স্বার্থে কাজ করবে তা মানা যায় না। এইসব বন্ধে আইন নীতিমালার পরিবর্তনের দরকার আছে। এই ধরনের অনেক প্রশ্ন আমাদের তুলতে হবে। এতোদিন কথাগুলো শোনা হয়নি, কর্ণপাত করা হয়নি নানা কায়েমি স্বার্থের কারণে। এখন কর্ণপাত করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার অন্তত যেন কথাগুলো শুনেন, সমস্যাগুলো সমাধান করেন এটা জনগণের প্রত্যাশা।’
মো.শাহরিয়ার বলেন, ‘এই সেক্টর নিয়ে কেন সরকারের দায়িত্বশীল লোকজন ভাবে না, তার কারণ হচ্ছে এই সেক্টর সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা আছে। তাই যে কোন সমস্যা হলে রিক্রুটিং এজেন্সিকেই দায়ী করা হয়। কোন একটা ডিমান্ড লেটার পাওয়া গেলে তাতে এম্বাসির সত্যায়ন লাগে, এম্বাসি যাচাই বাচাই করে সেগুলো সত্যায়ন করে থাকে। কোন একজন কর্মী বিদেশে গিয়ে যদি কোন সমস্যায় পড়ে তখন এককভাবে আমাদেরকেই দায়ী করা হয়, এম্বাসি কোন দায় নেয় না। অথচ এম্বাসিরই দায়িত্ব সমস্যা সমাধানের, আমরা এই দেশ থেকে গিয়ে তো সমাধান করতে পারবো না। এই সরকার চাইলে এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করতে পারে, কিন্তু সে রকম কোন উদোগ আমরা দেখছি না।’
সৈয়দা পারভীন আক্তার বলেন, ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলা হয়, এই যোদ্ধাদের কারিগর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হয়ে আছে সেটা অত্যন্ত লজ্জাকর। কাজ করতে গেলে সমস্যা হবে, সব সমস্যার জন্য এই এজেন্সিগুলাকেই দায়ী করা হয়।
আমদের দেশ থেকে প্রচুর গৃহকর্মী যেত একসময়, এই গৃহকর্মী নিয়ে প্রচুর নেতিবাচক প্রচারণা আছে। এনজিওসহ বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয় এই গৃহকমীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কিছু সমস্যা যে হচ্ছে না তা নয়, কিন্তু কেন সমস্যা হচ্ছে, কিভাবে সমস্যাগুলো সমাধান করা যাবে এই নিয়ে উদ্যোগ না নিয়ে একটা নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়। এতে কর্মীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এই সেক্টরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে যে জিরো মাইগ্রেশন কস্টে লোক পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে, সেটা কেবল গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রেই হচ্ছে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আর আমাদের রিক্রুটিং এজন্সিগুলো অনলাইনের মাধ্যমে জিরো কস্টে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। গ্রামের অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলের একেবারে পিছিয়ে থাকা নারীরা যাচ্ছেন। অনেক সময় নিয়োগকারী কোম্পানির চাপে যথাযথ ট্রেনিং ছাড়াই তাদের পাঠাতে হচ্ছে। সেখানে কোন সমস্যা যদি হয় সেটা তদন্ত করে সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব কার? একটা হতদরিদ্র নারী সৌদিতে কাজ করে মাসে ত্রিশ বত্রিশ হাজার টাকা পাচ্ছেন, যা আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরের তুলনায় অনেক বেশি। অথচ বিষয়টাকে আমরা নেতিবাচক ভাবে উপস্থাপন করছি।’
তিনি বলেন, ‘এই কর্মী পাঠানোর একটা টাইম ফ্রেম আছে, এর মধ্যে না পাঠাতে পারলে আমাদের জরিমানা করা হয়। সার্ভার বন্ধ করে দিতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের দিক থেকে কোন অনিয়ম হলে আমাদের দিক থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এর কারণ হচ্ছে তাদের সঙ্গে যে এমওইউ করা হয়েছে সেগুলো অনেক দুর্বল, এগুলোতে তাদের পক্ষের স্বার্থ দেখা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই নারী গৃহকর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটা একটা সফটওয়্যারের মাধ্যমে হয়, একজন নারী কর্মী সিলেক্ট করা থেকে শুরু করে, কতোদিন সৌদি আরবে থেকেছে, কবে ফিরে এসেছে তা আমরা জানতে পারি। সফটওয়্যারের মাধ্যমে জিরো কস্টে কর্মী প্রেরণ এখনো চলছে। অনলাইনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে জিরো কস্টে কর্মী পাঠানোর জন্য এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি।’
আমির হোসেন ভূঞা টিপু বলেন,‘ আমরা আশা করেছি এই সেক্টরের দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এখনো সেরকম কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমরা অনেক কষ্ট করে ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ করি, অথচ সেগুলো সত্যায়ন করতে হয় এম্বাসিকে। এম্বাসিগুলো এই সত্যায়নে অনেক সময় ক্ষেপণ করে, এতে লোক পাঠাতে দেরি হয়। নিয়োগকারী কোম্পানিগুলো বিরক্ত হয়ে আমাদের দেশে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এম্বাসির খামখেয়ালির কারণে আমাদের শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
খোকন দাস
সম্পাদক মন্ডলি
সৈয়দা পারভীন আক্তার
ফকরুদ্দীন কবীর আতিক
মোঃ ইলিয়াস হোসেন
মোঃ শাহাদাত হোসেন
পরিচালক মন্ডলি
ছিদ্দিকুর রহমান ভুঞ্রা (পরিচালক, ফিন্যান্স)
মোস্তাফিজুর রহমান (পরিচালক, পাবলিকেশন)
শান্ত দেব সাহা (পরিচালক, এইচ আর)
শাহরিয়ার হোসেন (পরিচালক, মার্কেটিং)
বার্তা সম্পাদক
মোঃ হাবীবুল্লাহ্
সিনিয়র রিপোর্টার
মোঃ জাকির হোসেন পাটওয়ারী
ভারপ্রাপ্ত প্রকাশক, আরিফুর রহমান কর্তৃক
ডা. নওয়াব আলী টাওয়ার, ২৪ পুরানা পল্টন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
ফোনঃ +৮৮ ০১৭৩২ ৪১৭ ৫১৭
Email: news@probasonnews.com
©২০২৪ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || ProbasonNews.com